হজের প্রস্তুতি ও জরুরি মাসায়েল: প্রশ্নোত্তর (কুরআন-সুন্নাহর আলোকে)
হজের সফর অত্যন্ত বরকতময় এবং ইবাদত কবুলের এক অনন্য সুযোগ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
“মানুষের মধ্যে যার সেখানে (কাবা ঘর) যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)
হজের প্রস্তুতি হিসেবে মাসায়েল ও হজের নিয়মাবলী সঠিকভাবে জানা প্রত্যেক হাজীর জন্য অপরিহার্য। কারণ, সঠিক জ্ঞান ছাড়া হজের মতো মহান ইবাদত ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ হজের বিভিন্ন বিষয়ে দর্শকদের করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন।
আত তাবলীগ হজ্জ সার্ভিসেস-এর পক্ষ থেকে সম্মানিত হাজীদের সুবিধার্থে সেই অমূল্য প্রশ্নোত্তরগুলো বিষয়ভিত্তিক ও কুরআন-হাদিসের দলিলসহ নিচে তুলে ধরা হলো। এই পোস্টটি আপনাকে হজের সফরের জন্য মানসিকভাবে এবং জ্ঞানগতভাবে আরও সমৃদ্ধ করবে।

১. হজের মৌলিক ইতিহাস ও দর্শন
প্রশ্ন: তওয়াফ কেন করি এবং এর ইতিহাস কী? মিনা ও মুজদালিফায় কেন রাত্রি যাপন করি?
উত্তর: তাওয়াফহলো আল্লাহর ঘরের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করার প্রতীক। এর ইতিহাস হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সাথে জড়িত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তারা যেন সুপ্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে।” (সূরা হজ: ২৯)।
মিনা ও মুজদালিফায় রাত্রি যাপন করা মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়মকানুন শিখে নাও।” (সহীহ মুসলিম: ১২৯৭)। মুজদালিফার বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশয়ারিল হারামের (মুজদালিফা) কাছে আল্লাহকে স্মরণ করবে।” (সূরা বাকারা: ১৯৮)।
২. ইহরাম ও মিকাত সংক্রান্ত মাসায়েল
প্রশ্ন: মিকাত অতিক্রম করার সময় একা থাকলে এহরাম করা কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ। মিকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব, তা একা থাকুন বা দলের সাথে। রাসূল (সা.) মিকাতগুলো নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং বলেছেন, “এগুলো তাদের জন্য এবং যারা এসব মিকাত দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের জন্য।” (সহীহ বুখারী: ১৫২৪)।
প্রশ্ন: এহরামের কাপড় পরার আগে কি শরীরে সুগন্ধি লাগানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ইহরামের নিয়ত করার আগে শরীরে (কাপড়ে নয়) সুগন্ধি লাগানো সুন্নাহ। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি রাসূল (সা.)-কে ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম।” (সহীহ বুখারী: ১৫৩৯)।
প্রশ্ন: এহরামের কাপড় খুলে কি গামছা পরে গোসল করা যাবে? এহরামরত অবস্থায় ব্যথানাশক মলম লাগানো যাবে?
উত্তর: ইহরাম অবস্থায় সাবান বা সুগন্ধি ছাড়া সাধারণ গোসল করা এবং ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করে অন্য সেলাইবিহীন কাপড় বা গামছা পরা সম্পূর্ণ জায়েজ। আর ব্যথানাশক মলম বা ম্যানথল (যেগুলোতে আতর বা পারফিউমের মতো সুগন্ধি নেই) ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই।
প্রশ্ন: এহরামের নিয়তের পর কি দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নাহ?
উত্তর: ইহরামের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো নামাজ নেই, তবে মিকাতে পৌঁছানোর পর ওয়াক্তিয়া নামাজ বা তাহিয়্যাতুল ওজুর ২ রাকাত নামাজ পড়ে ইহরামের নিয়ত করা উত্তম।
৩. তাওয়াফ ও সাঈর বিধি বিধান
প্রশ্ন: তওয়াফ করার সময় ওযু নষ্ট হলে কি তায়াম্মুম করা যাবে?
উত্তর: তাওয়াফের জন্য ওযু শর্ত। রাসূল (সা.) বলেছেন, “বাইতুল্লাহর তাওয়াফহলো নামাজের সমতুল্য, তবে এতে আল্লাহ কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন।” (সুনান তিরমিজি)। তাই ওযু ভেঙে গেলে পুনরায় ওযু করে আসতে হবে। পানি থাকা অবস্থায় তায়াম্মুম করা যাবে না।
প্রশ্ন: হাজরে আসওয়াদে সরাসরি চুমু দেওয়া আর ইশারা করার ফজিলত কি একই?
উত্তর: ভিড়ের কারণে যদি সরাসরি চুমু দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে দূর থেকে ইশারা করলেও সুন্নাহ আদায় হয়ে যাবে এবং ইনশাআল্লাহ সমান সওয়াব পাওয়া যাবে। রাসূল (সা.) উটের ওপর বসে তাওয়াফ করার সময় ছড়ি দিয়ে ইশারা করেছিলেন। (সহীহ বুখারী: ১৬১৩)।
প্রশ্ন: তওয়াফ ও সাঈর সময় কি বাংলায় দোয়া করা যাবে?
উত্তর: অবশ্যই। আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন। নির্দিষ্ট আরবি দোয়া মুখস্থ না থাকলে নিজের মাতৃভাষা বাংলায় মন খুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করাই সর্বোত্তম।
৪. মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফা ও পাথর নিক্ষেপ
প্রশ্ন: ভুল করে ১০ জিলহজ ছোট জামরায় পাথর নিক্ষেপ করলে কী করতে হবে?
উত্তর: ১০ই জিলহজ শুধুমাত্র বড় জামরায় (জামারাতুল আকাবা) পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। ভুল করে ছোট বা মধ্যম জামরায় নিক্ষেপ করলে তা ধর্তব্য হবে না, পুনরায় বড় জামরায় নিক্ষেপ করতে হবে।
প্রশ্ন: মুজদালিফায় ছাতা ব্যবহার করলে কি খোলা আকাশের নিচে থাকার বরকত নষ্ট হবে?
উত্তর: না, রোদ, বৃষ্টি বা শিশির থেকে বাঁচতে ছাতা বা স্লিপিং ব্যাগ ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। এতে খোলা প্রান্তরে থাকার হুকুম বা সওয়াব নষ্ট হবে না।
প্রশ্ন: ১০ বা ১১ জিলহজ যদি এজেন্সি আগেভাগে বিদায় তওয়াফ করতে বাধ্য করে, তবে কি ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে?
উত্তর: বিদায় তাওয়াফ হজের সর্বশেষ কাজ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “কারো শেষ কাজ যেন হয় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ।” (সহীহ মুসলিম: ৩২৮৪)। এজেন্সি বাধ্য করলেও বিদায় তাওয়াফ মক্কা ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই করতে হবে।
৫. নারী ও মাহরাম সংক্রান্ত বিশেষ মাসায়েল
প্রশ্ন: হজের সফরে যাওয়ার সময় স্ত্রীর মাসিক শুরু হলে করণীয় কী?
উত্তর: মাসিক অবস্থায় নারী ইহরাম বাঁধবেন এবং তালবিয়া পড়বেন। তিনি তাওয়াফ ব্যতীত হজের বাকি সব কাজ (আরাফাহ, মুজদালিফা, মিনা, পাথর নিক্ষেপ) স্বাভাবিকভাবে করবেন। আয়েশা (রা.)-এর মাসিক হলে রাসূল (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, “হাজীরা যা করে তুমি তার সবই করো, কেবল পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করো না।” (সহীহ বুখারী: ২৯৪)।
প্রশ্ন: এহরামরত অবস্থায় মহিলারা কি রাতে মাথা খোলা রেখে ঘুমাতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তাঁবুর ভেতরে বা গায়রে মাহরাম পুরুষ না থাকলে মহিলারা মাথা খোলা রেখে ঘুমাতে পারবেন। ইহরামে মহিলাদের জন্য মুখমণ্ডল খোলা রাখা জরুরি, মাথা নয়।
প্রশ্ন: মহিলারা কি হজে স্বর্ণের গহনা পরিধান করতে পারবেন?
উত্তর: পরিধান করতে পারবেন, তবে তা যেন পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
প্রশ্ন: মায়ের মাহরাম হওয়ার জন্য ছেলের বয়স কত হওয়া প্রয়োজন?
উত্তর: ছেলেকে অবশ্যই বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক এবং বুদ্ধিমান হতে হবে। নাবালক শিশু মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে না।
৬. বিবিধ ও গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: হজের সফরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বা তর্ক হলে করণীয় কী?
উত্তর: হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন, “হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, কোনো গুনাহের কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ করা যাবে না।” (সূরা বাকারা: ১৯৭)। তর্ক হয়ে গেলে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং একে অপরের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
প্রশ্ন: মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় কি নামাজ কসর করতে হবে?
উত্তর: মুসাফির হলে কসর পড়বেন। মিনা, আরাফাহ ও মুজদালিফায় রাসূল (সা.) কসর পড়েছেন। তবে মক্কায় যদি আপনার ১৫ দিনের বেশি থাকার নিয়ত থাকে, তবে আপনি মুকিম হিসেবে পুরো নামাজ পড়বেন।
প্রশ্ন: হজ শেষে দেশে ফেরার পর যদি কোনো ভুলের জন্য দম ওয়াজিব হওয়ার কথা মনে পড়ে?
উত্তর: হজের কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে ‘দম’ (একটি ছাগল বা ভেড়া কোরবানি) দেওয়া ওয়াজিব হয়। দেশে ফিরে মনে পড়লে মক্কায় অবস্থানরত কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মক্কার হেরেম সীমানায় পশু জবেহ করে তা আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন: বাবা-মাকে আগে হজে না পাঠিয়ে কি সন্তান নিজে হজ করতে পারবে?
উত্তর: সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর নিজের হজ ফরজ। নিজের হজ আদায় করা আগে জরুরি। তবে পিতা-মাতার সামর্থ্য না থাকলে সন্তান যদি তাদের হজে পাঠায়, তবে এটি চরম সওয়াবের কাজ (উত্তম আচরণ বা বিররুল ওয়ালিদাইন)।
শেষ কথা
হজ একটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত, যা সম্পাদনের জন্য প্রচুর ধৈর্য ও সঠিক জ্ঞানের প্রয়োজন। উপরোক্ত প্রশ্নোত্তরগুলো আপনার হজের সফরকে আরও সহজ ও সুন্নাহসম্মত করবে বলে আমরা আশাবাদী।
আত তাবলীগ হজ্জ সার্ভিসেস সর্বদা আপনাদের একটি নিরাপদ, আরামদায়ক এবং শরীয়াহ সম্মত হজের নিশ্চয়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। হজের প্যাকেজ বা অন্যান্য মাসায়েল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের হজকে ‘হজ্বে মাবরুর’ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
আপনার মতামত বা আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। পোস্টটি অন্যান্য হজ যাত্রীদের সাথে শেয়ার করে দ্বীনি খেদমতে শরিক হোন।
আত-তাবলীগ হজ্জ সার্ভিসেস
রাজকীয় সৌদী সরকারের হজ যাত্রী সেবায় পুরুস্কার প্রাপ্ত হজ এজেন্সী
বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের বৈধ হজ এজন্সেী লাইসেন্স নং -১৩৪২
বাংলাদেশ সরকারে সিভিল এভিয়েশন এর অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সী
ট্রুর অপারেটর ট্রুরিজম বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ট্রুর অপারেটর
IATA Approved Company : 42335904
We are Bangladesh Govt approved valid Haj License and ITA approved organization. Your trusted travel agent
আমাদের ইমু ও হোয়াটস এপ নং সমূহ



