Menu
সুরা কাসাসের গল্প

হজরত মুসা (আ.)-এর জীবনের ৫টি মোড় ও শিক্ষা: সুরা কাসাসের গল্প

প্রতিটি নবীর জীবনই আমাদের জন্য শিক্ষার এক বিশাল ভাণ্ডার। তবে হজরত মুসা (আ.) এর জীবন যেন সবচেয়ে বেশি নাটকীয় এবং শিক্ষণীয়। একদিকে ফিরাউনের অত্যাচার আর অন্যদিকে আল্লাহর অসীম কুদরত। সুরা কাসাসে আল্লাহ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয় একটি জীবন্ত ছবি চোখের সামনে ভাসছে।

এই সুরায় রয়েছে পাঁচটি বড় মোড় বা টার্নিং পয়েন্ট যেখান থেকে আমরা দারুণ কিছু অমূল্য শিক্ষা পাই। চলুন সেই মোড়গুলো জেনে নিই।

মোড় ১: জন্মের দিনই মৃত্যুর পরোয়ানা এবং আল্লাহর হিফাজত

ফিরাউন স্বপ্নে দেখল বনী ইসরাঈলের এক শিশু তার রাজত্ব ধ্বংস করবে। তাই সে বনী ইসরাঈলের সব নবজাতক ছেলে শিশুকে হত্যার নির্দেশ দিল। ঠিক সেই কঠিন সময়ে হজরত মুসা (আ.) জন্ম নিলেন। মায়ের বুকে তখন চরম আতঙ্ক। কিন্তু আল্লাহ মায়ের অন্তরে ইলহাম পাঠালেন, “তাকে দুধ খাওয়াও। ভয় পেলে নদীতে ভাসিয়ে দাও। ভয় পেয়ো না, দুঃখ করো না। আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূল বানাব।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭)

মা আল্লাহর নির্দেশে তাই করলেন। নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া সেই শিশুকে ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া কুড়িয়ে নিলেন। যে ফিরাউন তাঁকে মারতে চেয়েছিল তারই প্রাসাদে হজরত মুসা (আ.) বড় হতে লাগলেন।

শিক্ষা: আল্লাহ যাকে বাঁচাতে চান পুরো দুনিয়া মিলেও তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তিনি শত্রুর ঘরেও নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দেন। জীবনে চাকরি, সম্পদ বা মানুষের যত ভয়ই থাকুক না কেন সবসময় মনে রাখবেন আল্লাহর সেই আশ্বাস— “ভয় পেয়ো না, দুঃখ করো না”।

মোড় ২: শত্রুর ঘরে বেড়ে ওঠা এবং আল্লাহর ওয়াদা পূরণ

ফিরাউনের রাজপ্রাসাদেই মুসা (আ.) বড় হলেন। সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রাজকীয় আয়োজনে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনি কোনো ধাত্রীর দুধ পান করছিলেন না। অবশেষে তাঁর নিজের মাকেই ডেকে আনা হলো। ফিরাউনের প্রাসাদ থেকেই মুসা (আ.) এর মা পারিশ্রমিক নিয়ে নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে লাগলেন।

আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ১৩)

শিক্ষা: আল্লাহ যখন কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করেন, তিনি তা অবশ্যই পূরণ করেন। তিনি যখন রিজিক দেওয়ার কথা বলেন, তিনি ঠিকই দেন। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ হয় না।

মোড় ৩: অনিচ্ছাকৃত ভুল এবং দ্রুত ক্ষমা লাভ

একদিন হজরত মুসা (আ.) দেখলেন একজন বনী ইসরাঈলি ও একজন মিসরীয় ঝগড়া করছে। তিনি সাহায্য করতে গিয়ে মিসরীয় লোকটিকে একটি ঘুষি মারেন এবং লোকটি মারা যায়। মুসা (আ.) সাথে সাথে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, “হে আমার রব, আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ১৬) আল্লাহ তাঁকে তখনই ক্ষমা করে দিলেন।

শিক্ষা: মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল হতেই পারে। অনেক বড় ভুলও হতে পারে। কিন্তু দেরি না করে সাথে সাথে তাওবা করলে আল্লাহ দ্রুত ক্ষমা করে দেন।

মোড় ৪: নিঃস্ব অবস্থায় মাদইয়ানে এবং আল্লাহর রহমত

ফিরাউন হত্যার পরিকল্পনা করছে জানতে পেরে হজরত মুসা (আ.) মাদইয়ানে পালিয়ে গেলেন। তিনি ছিলেন একা, ক্ষুধার্ত ও ভিনদেশি। একটি কূপের পাশে দুই মেয়েকে পানি তুলতে সাহায্য করার পর গাছের ছায়ায় বসে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, “হে আমার রব, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪) আল্লাহ তাঁকে আশ্রয়, কর্মসংস্থান এবং পরিবার সবই একসঙ্গে মিলিয়ে দিলেন।

শিক্ষা: আল্লাহর কাছে সবসময় নির্দিষ্ট করে কিছু চাইতে হয় না। শুধু নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তাঁর কল্যাণের মুখাপেক্ষী হলে তিনি আমাদের চাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি দান করেন।

মোড় ৫: নবুওয়াত লাভ এবং জীবনের চূড়ান্ত মিশন

মাদইয়ানে দশ বছর কাটানোর পর ফেরার পথে তুর পাহাড়ের কাছে তিনি আগুন দেখতে পান। সেখানে যাওয়ার পর আল্লাহ তাঁকে সরাসরি ডাক দেন, “আমিই আল্লাহ, বিশ্বজগতের রব।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৩০) নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া সেই শিশুটিকে আল্লাহ নবী বানালেন। যাকে ফিরাউন মারতে চেয়েছিল তাকেই ফিরাউনের কাছে হেদায়েতের বার্তা দিয়ে পাঠালেন।

শিক্ষা: জীবনের প্রতিটি বাঁক ও কষ্টের পেছনে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকে। অন্ধকারের পর আলো আর কষ্টের পর স্বস্তি আসে, সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় আল্লাহর হাতে।


হজরত মুসা (আ.) এর জীবন আমাদের শেখায় জীবনে অনেক কঠিন সময় আসবে। কখনো মনে হতে পারে সব শেষ বা সামনে কোনো পথ নেই। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কখনোই একা ছাড়েন না।

আপনি আজ জীবনের যে মোড়েই থাকুন না কেন, হতাশ হবেন না। ভয়ে থাকলে মনে রাখবেন “ভয় পেয়ো না, দুঃখ করো না”। ভুল করে থাকলে পড়ুন “হে আমার রব, আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি”। আর সব হারিয়ে নিঃস্ব বোধ করলে বলুন “আমি আপনার কল্যাণের মুখাপেক্ষী”।

সুরা কাসাস মক্কায় অবতীর্ণ একটি সুরা। মক্কায় যখন নবীজি (সা.) ও সাহাবিরা কুরাইশদের অত্যাচারে কঠিন সময় পার করছিলেন, তখন আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) এর এই ঘটনা শুনিয়ে তাঁদের সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। বুঝিয়েছিলেন, আগের নবীরাও কষ্ট পেয়েছেন এবং আল্লাহ সবসময় তাঁদের সাহায্য করেছেন।