ইসলামি ইতিহাসের পাতায় মক্কার যে কয়টি ঐতিহাসিক স্থান অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়, তার মধ্যে ‘বীর তুওয়া‘ অন্যতম। ‘বীর’ শব্দের অর্থ কূপ এবং ‘তুওয়া’ অর্থ ভাঁজ করা বা প্যাঁচানো। মক্কার জারাওয়াল এলাকায় অবস্থিত এই কূপটি কেবল একটি পানির উৎস নয়, বরং এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান。

১. পবিত্র কুরআনের আলোয় ‘তুওয়া’ উপত্যকা
পবিত্র কুরআনে ‘তুওয়া’ নামক উপত্যকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে গণ্য। মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা (আ.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
“নিশ্চয়ই আমি তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল; কারণ তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ।” (সূরা ত্বা-হা, ২০:১২)
যদিও অনেক মুফাসসিরের মতে কুরআনে বর্ণিত উপত্যকাটি সিনাই পর্বত এলাকায় অবস্থিত, তবে মক্কার এই ‘তুওয়া’ এলাকাটিও নবীগণের আগমনে ধন্য এবং বরকতময়।

২. হাদীসের আলোকে বীর তুওয়ার গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এই কূপটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। হাদীস শরীফ থেকে এর কয়েকটি তাৎপর্য নিচে তুলে ধরা হলো:
- নবীজি (সা.)-এর বিশ্রামস্থল: মক্কা বিজয়ের সময় এবং ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশের আগে রাসূল (সা.) এই বীর তুওয়া নামক স্থানে রাত্রিযাপন করতেন।
- পবিত্রতা ও গোসল: নবী কারীম (সা.) এই কূপের পানি দিয়ে গোসল করতেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মক্কায় প্রবেশের আগে এখানে গোসল করে নিজেকে পবিত্র করে নিতেন।
- সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) যখনই মক্কায় প্রবেশ করতেন, তিনি বীর তুওয়ায় রাত্রিযাপন না করে এবং এই কূপের পানি দিয়ে গোসল না করে মক্কায় প্রবেশ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

৩. মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক সাক্ষী
৮ হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় এই বীর তুওয়া ছিল মুসলিম বাহিনীর একটি কৌশলগত কেন্দ্র। এখান থেকেই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর সেনাদলকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে মক্কার বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে এই স্থানটি ইসলামের বিজয়ের ইতিহাসের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

৪. বর্তমান অবস্থা ও দর্শনার্থীদের জন্য পরামর্শ
বর্তমানে এই কূপটি সৌদি সরকারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক ভবনের নিচে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি মসজিদে হারাম থেকে প্রায় ১-২ কিলোমিটার দূরত্বে জারাওয়াল এলাকায় অবস্থিত।
- ভ্রমণ: হজ বা ওমরাহ পালনকারীরা সহজেই ট্যাক্সি বা বাসে করে এই স্থানে যেতে পারেন।
- করণীয়: এখানে কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত নেই, তবে নবীজি (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণে এই স্থানটি পরিদর্শন করা ঈমানি চেতনাকে উজ্জীবিত করে।
- Query unsuccessful
বিবরণ অনুযায়ী বীর তুওয়া (Bir Tuwa) বা তুওয়া কূপ মক্কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় ঐতিহাসিক স্থান। জারাওয়াল এলাকায় অবস্থিত এই কূপটির সাথে নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং ইসলামের ইতিহাসের গভীর সংযোগ রয়েছে।
মসজিদ

এখানে একটি মসজিদও নির্মিত হয়েছিল। নাফি (রহ.) থেকে বর্ণিত: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) তাকে অবহিত করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর মুখমণ্ডল সেই দুটি ছোট পাহাড়ের দিকে ফিরিয়েছিলেন যা তাঁর এবং কাবার পাশে অবস্থিত দীর্ঘ পাহাড়টির মধ্যবর্তী স্থানে ছিল। সেখানে নির্মিত মসজিদটি পাহাড়ের বাম দিকে অবস্থিত ছিল। আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সালাত আদায়ের স্থানটি ছিল কালো পাহাড়ের নিচের দিকে, প্রায় দশ হাত বা তার কাছাকাছি দূরত্বে। তিনি ﷺ তখন দীর্ঘ পাহাড়ের এই দুটি ছোট পাহাড়ের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন যা আপনার এবং কাবার মাঝখানে অবস্থিত। [সহীহ মুসলিম]
নবম শতাব্দীর ঐতিহাসিক আবু আবদুল্লাহ ফাকিহি তাঁর ‘আখবার মক্কা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, মসজিদটি তুওয়া কূপের দিকে যাওয়ার রাস্তার ডান পাশে এবং একদম নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। এই মসজিদটি সম্প্রতি ভেঙে ফেলার আগ পর্যন্ত সেখানে বিদ্যমান ছিল।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য
- নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিশ্রামস্থল: ৬ হিজরিতে উমরাহ করার সময় এবং ৮ হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় নবী (সা.) মক্কায় প্রবেশের আগে এই কূপের কাছে রাত্রিযাপন করেছিলেন।
- গোসল ও পবিত্রতা: নবী (সা.) বীর তুওয়া কূপের পানি দিয়ে গোসল করেছিলেন। তিনি মক্কায় প্রবেশের আগে পবিত্র হওয়ার জন্য এখান থেকেই পানি সংগ্রহ করতেন।
- হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের সুন্নত: বহু সাহাবী এবং পরবর্তী যুগের আলেমগণ নবী (সা.)-এর অনুসরণে মক্কায় প্রবেশের আগে বীর তুওয়া কূপের পানি দিয়ে গোসল করাকে মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন। ইবনে উমর (রা.) সবসময় মক্কায় প্রবেশের আগে এখানে রাত্রিযাপন করতেন এবং গোসল করতেন।
- মক্কা বিজয়: ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী (সা.) তাঁর সেনাদলকে বীর তুওয়ায় বিভক্ত করেছিলেন। এখান থেকেই মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন দিক দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে।
বর্তমান অবস্থা
মসজিদে হারামের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই কূপটি বর্তমানে সৌদি সরকারের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত আছে। এলাকাটি আধুনিকায়নের ফলে কূপের চারপাশে দেয়াল ও নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা কূপটি বাইরে থেকে দেখার সুযোগ পান, যদিও বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে কূপের ভেতরে নামা বা সরাসরি পানি সংগ্রহ করা নিয়ন্ত্রিত।
বীর তুওয়া কূপের খনন ও সংস্কার
কথিত আছে যে, এই কূপটি খনন করেছিলেন আবদ শামস বিন আবদ মানাফ। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রপিতামহ হাশিম বিন আবদ মানাফের ভাই। পরবর্তী সময়ে আকিল ইবনে আবি তালিব (রা.) এটি পুনরায় খনন বা সংস্কার করেন।
বীর তুওয়ার ঐতিহাসিক পটভূমি
বিদায় হজ (The Farewell Hajj)
বিদায় হজের সময় মক্কায় প্রবেশের আগে নবী কারীম ﷺ ‘যু-তুওয়া‘ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন, যা বর্তমানে ‘জারাওয়াল’ বা ‘আবার আল-জাহির’ নামে পরিচিত। তিনি সেখানে রাত যাপন করেছিলেন।
- ফজর সালাত: ৪ঠা জিলহজ সকালে নবী ﷺ সেখানকার মসজিদের ভেতর নয়, বরং মসজিদের কাছে অবস্থিত একটি বড় ঢিবির নিকট ফজর সালাত আদায় করেন।
- গোসল: মক্কায় প্রবেশের আগে তাঁর নিয়মিত অভ্যাস অনুযায়ী তিনি বীর তুওয়া কূপের পানি দিয়ে গোসল সম্পন্ন করেন।
এটি আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এরও নিয়মিত অভ্যাস ছিল। নাফি ইবনে আবি নুআইম (রহ.) বর্ণনা করেন:
“ইবনে উমর (রা.) যখনই মক্কায় আসতেন, তিনি ভোর না হওয়া পর্যন্ত যু-তুওয়ায় রাত কাটাতেন এবং তারপর মক্কায় প্রবেশ করতেন। ফেরার পথেও তিনি যু-তুওয়া হয়ে আসতেন এবং ভোর পর্যন্ত সেখানে রাত কাটাতেন। তিনি বলতেন যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ-ও এমনটিই করতেন।”
(সহীহ বুখারী)
মক্কা বিজয় (Conquest of Makkah)
মক্কা বিজয়ের সময়ও নবী ﷺ এই স্থানে যাত্রা বিরতি করেছিলেন। মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তিনি তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে যু-তুওয়া পর্যন্ত পৌঁছান।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন যে, মক্কার সামনে যুদ্ধের জন্য কোনো প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনী নেই। তিনি থামলেন, নিজের সওয়ারির ওপর আরোহণ করলেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন।
- সেনাবাহিনী বিন্যাস: এই স্থানেই তিনি মুসলিম বাহিনীকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে বা সেনাদলে বিভক্ত করেছিলেন।
- প্রস্তুতি: পরদিন সকালে শহরে প্রবেশের আগে তিনি কূপের পানি পান করেন, ওযু সম্পন্ন করেন এবং এরপর মক্কায় প্রবেশ করেন।

বীর তুওয়া ভ্রমণের নিয়ম
আপনি যদি সেখানে যেতে চান:
- ১. এটি মসজিদে হারামের খুব কাছেই (প্রায় ১-২ কিমি দূরত্বে) অবস্থিত।
- ২. বাসে বা ট্যাক্সিতে করে সহজেই জারাওয়াল (Jarwal) এলাকায় যাওয়া যায়।
- ৩. এখানে গিয়ে ইবাদতের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, তবে নবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান হিসেবে এটি পরিদর্শন করা সওয়াব ও বরকতের কাজ।
উপসংহার
বীর তুওয়া কেবল একটি প্রাচীন কূপ নয়, বরং এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিনয় এবং সুন্নাহর এক জীবন্ত নিদর্শন। মক্কার আধুনিকায়নের মাঝেও এই স্থানটি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনে।
আত-তাবলীগ হজ্জ সার্ভিসেস
রাজকীয় সৌদী সরকারের হজ যাত্রী সেবায় পুরুস্কার প্রাপ্ত হজ এজেন্সী
বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের বৈধ হজ এজন্সেী লাইসেন্স নং -১৩৪২
বাংলাদেশ সরকারে সিভিল এভিয়েশন এর অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সী
ট্রুর অপারেটর ট্রুরিজম বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ট্রুর অপারেটর
IATA Approved Company : 42335904
We are Bangladesh Govt approved valid Haj License and ITA approved organization. Your trusted travel agent
আমাদের ইমু ও হোয়াটস এপ নং সমূহ




