Menu
জাবাল আবু কুবাইস এবং কাবার প্রাচীন কোনো ছবি

জাবাল আবু কুবাইস: মক্কার পবিত্র ও ঐতিহাসিক পাহাড়ের অজানা ইতিহাস এবং তাৎপর্য

মক্কার পবিত্র মসজিদে হারামের পাশে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জাবাল আবু কুবাইস’ পাহাড়ের ইতিহাস, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার অলৌকিক ঘটনা এবং এর ইসলামি তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

জাবাল আবু কুবাইস (Jabal Abu Qubais) (আরবি: جبل أبو قبيس) হলো পবিত্র মসজিদে হারামের পূর্ব পাশে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পাহাড়। ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, এই স্থানেই প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) অলৌকিকভাবে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। বর্তমানে মসজিদে হারামের চলমান সম্প্রসারণ কাজের কারণে এই পর্বতের কেবল সামান্য অংশই অবশিষ্ট রয়েছে।

চলুন, মক্কার এই প্রাচীন পাহাড়ের ইতিহাস, নামকরণ এবং ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

‘আবু কুবাইস’ নামকরণের পেছনের ইতিহাস

এই পর্বতের নাম কেন ‘আবু কুবাইস’ হলো, তা নিয়ে হিজাজবাসীদের মাঝে বিভিন্ন লোকবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে:

  • আবু কুবায়স নামক ব্যক্তির নামানুসারে: জুরহুম গোত্রের ‘আবু কুবায়স’ নামক এক ব্যক্তি আমর ইবনে মুদাদের পরিবারের একজনকে অপবাদ দিয়েছিলেন। আমরের রোষানল থেকে বাঁচতে তিনি এই পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই তার মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফলে তার নামেই পাহাড়টি পরিচিতি পায়।
  • রাজা আবু কাবুসের নামানুসারে: প্রখ্যাত আরব পণ্ডিত আল-জাহিযের মতে, প্রাচীন আরব শাসক রাজা আবু কাবুসের নামে এই পর্বতের নামকরণ করা হয়েছিল।
  • আল-আমিন (বিশ্বস্ত): প্রাক-ইসলামিক যুগে এটি ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত নামে পরিচিত ছিল। কারণ, হযরত আদম (আ.)-এর সময়ে অবতীর্ণ পবিত্র হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথরটি নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময় এই পাহাড়েই নিরাপদে রাখা হয়েছিল।

ইসলামে জাবাল আবু কুবাইসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যে জাবাল আবু কুবাইস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  1. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার মুজিজা: নবী মুহাম্মদ (সা.) এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অলৌকিকভাবে চাঁদকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন।
  2. পৃথিবীর প্রথম পাহাড়: ঐতিহাসিকদের মতে, এটি পৃথিবীতে আল্লাহর সৃষ্টি করা প্রথম পাহাড়।
  3. মসজিদে হারামের নৈকট্য: পবিত্র কাবার এবং মসজিদে হারামের সবচেয়ে কাছের পাহাড় হওয়ায় এর ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
  4. হযরত আদম (আ.) এর স্মৃতি: অনেক বর্ণনামতে, হযরত আদম (আ.)-এর কবর এই পর্বতের আশেপাশেই অবস্থিত।
  5. প্রাক-ইসলামিক ব্যক্তিত্বদের কবর: আসাদ ইবনে খুযাইমাহ, মুদরিকাহ ইবনে ইলয়াস সহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির কবর এখানে রয়েছে।
  6. হাজরে আসওয়াদের সংরক্ষণ: নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময় পবিত্র হাজরে আসওয়াদ এখানেই সুরক্ষিত ছিল।
  7. সাঈ এর সূচনা: সাফা পর্বত, যেখান থেকে হজের সাঈ শুরু করা হয়, তা এই পাহাড়ের তলদেশেই হাজরে আসওয়াদ কোণের দিকে মুখ করে অবস্থিত।

নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার অলৌকিক ঘটনা

৯ হিজরিতে (৬৩১ খ্রিস্টাব্দ) কুরাইশ মুশরিকরা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে নবুওয়াতের প্রমাণ দাবি করে। তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং অলৌকিকভাবে চাঁদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

চাঁদের একটি অংশ জাবাল আবু কুবাইস পর্বতের ওপরে এবং অন্য অংশটি এর চূড়ার নিচে দেখা যায়। বহু মানুষ এই অলৌকিক দৃশ্য অবলোকন করেছিল।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন: “আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় চাঁদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; একটি অংশ পাহাড়ের ওপরে থাকে, এবং অন্য অংশটি পাহাড়ের ওপারে চলে যায়। তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, ‘তোমরা এই অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকো।’” [সহীহ বুখারী]

এই অকাট্য প্রমাণের পরও অবিশ্বাসীরা এটিকে ‘জাদু’ বলে আখ্যায়িত করে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কামার (৫৪:১-২) আয়াতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

পৃথিবীর প্রথম পর্বত এবং হযরত আদম ও হাওয়া (আ.)

মক্কার ঐতিহাসিক আল-আযরাকির মতে, আবু কুবাইস ছিল পৃথিবীতে স্থাপিত প্রথম পাহাড়। ঐতিহাসিক আল-ইয়াকুবির বর্ণনামতে, পৃথিবীতে অবতরণের পর হযরত আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.) এই পাহাড়ের কাছে নেমেছিলেন। আদম (আ.) এই পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নেন, যার নাম ছিল গুপ্তধনের গুহা‘ (Cave of Treasure)

পণ্ডিত ইবনে সা’দের মতে, হযরত আদম (আ.) হজ পালনকালে হাজরে আসওয়াদ পাথরটি এই পর্বতে স্থাপন করেছিলেন, যা থেকে নির্গত আলো মক্কাকে আলোকিত করত।

নবী ইবরাহীম (আ.) ও হজের ঘোষণা

আল্লাহ যখন ইবরাহীম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কাবা নির্মাণের নির্দেশ দেন, তখন এই আবু কুবাইস পাহাড়েই হাজরে আসওয়াদ সুরক্ষিত ছিল। সেখান থেকেই পাথরটি এনে কাবার নির্ধারিত স্থানে বসানো হয়। কাবা নির্মাণের পর আল্লাহ তাকে হজের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিলে, তিনি এই আবু কুবাইস (বা সাফা) পর্বতে দাঁড়িয়েই বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে হজের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিক সামরিক গুরুত্ব

কৌশলগত অবস্থানের কারণে আবু কুবাইস পর্বতটি সামরিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল:

  • আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) এর বিদ্রোহ: ৬৪ হিজরিতে ইয়াজিদের সেনাপতি আল-হুসাইন বিন নুমাইর মক্কা অবরোধ করে এই পর্বত থেকে ক্যাটাপল্ট (পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) দিয়ে কাবার ওপর হামলা চালান।
  • আল-হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের আক্রমণ: ৭৩ হিজরিতে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে, আল-হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফপুনরায় এই পাহাড়ে ক্যাটাপল্ট স্থাপন করে আক্রমণ চালান, যার ফলে কাবায় আগুন ধরে যায় এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) শহীদ হন।

পাহাড়ের চূড়ায় ঐতিহাসিক মসজিদ ও রিবাত

নবম শতাব্দীর ঐতিহাসিক আল-ফাকিহির মতে, এই পর্বতের চূড়ায় একটি ইবরাহীম মসজিদ ছিল। ১১৮৩ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের এখানে একটি রিবাত (আশ্রয়কেন্দ্র) এবং মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখান থেকে পুরো মক্কা শহর দেখা যেত।

বলা হয়ে থাকে, মক্কা বিজয়ের পর সাহাবী বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) এই পর্বতে আরোহণ করে আযান দিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, যার ধ্বংসাবশেষ আজও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। ১৯ শতকে এখানে নকশবন্দী সুফি তরিকার বিভিন্ন ভবনও গড়ে উঠেছিল।