আত্মীয় ও মাহরামদের জন্য ঘরে প্রবেশের ইসলামি আদব কি
ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে একে অপরের ঘরে বা কক্ষে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইসলাম কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আজকের ব্লগে আমরা পবিত্র কোরআনের সূরা নূরের আলোকপাতে আত্মীয়-স্বজন ও মাহরামদের জন্য অনুমতি গ্রহণের বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
অনুমতি গ্রহণের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা
সুরা নূরের ২৭, ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াতে সাধারণভাবে কারও ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি চাওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত বাইরে থেকে আসা অপরিচিত বা আগন্তুকদের জন্য। কিন্তু আমাদের ঘরে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, যেমন—নিকট আত্মীয়, মাহরাম সদস্য বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মটি কিছুটা ভিন্ন ও নমনীয়। তবে তিনটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের জন্যও অনুমতি নেওয়া আবশ্যক করা হয়েছে।
নির্জনতার ৩টি বিশেষ সময় ও অনুমতির বিধান
পবিত্র কোরআনে তিনটি বিশেষ সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন ঘরের আপনজনদের জন্যও অন্যের কক্ষে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া জরুরি। এই সময়গুলো হলো:
১. ফজরের নামাজের আগে: এই সময়ে মানুষ সাধারণত ঘুম থেকে ওঠে বা ঘুমের পোশাকে থাকে। ২. দুপুরের বিশ্রামের সময়: যখন প্রখর রোদে বা কাজের ক্লান্তি দূর করতে মানুষ বিশ্রাম নেয় এবং হালকা পোশাক পরিধান করে। ৩. এশার নামাজের পর: এটি রাতের বিশ্রামের সময়।
কেন এই ৩ সময়ে অনুমতি প্রয়োজন?
এই সময়গুলোতে মানুষ সাধারণত একান্ত ব্যক্তিগত অবস্থায় থাকে। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সাথে একান্তে সময় কাটান অথবা বিশ্রামের জন্য শরীরের অতিরিক্ত কাপড় ঢিলেঢালা রাখেন। এই অবস্থায় হুট করে কেউ ঘরে ঢুকে পড়লে অপ্রস্তুত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তাই পারিবারিক গোপনীয়তা ও পর্দার মর্যাদা রক্ষায় এই বিধান দেওয়া হয়েছে।
শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়ম
অনেক সময় আমরা মনে করি ছোট বাচ্চারা তো কিছু বোঝে না, তাদের আবার অনুমতি কিসের? কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে, সমঝদার বা বুদ্ধিমান অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু এবং ঘরের দাস-দাসী (বা কাজের লোক), যারা সবসময় ঘরে যাতায়াত করে, তাদেরকেও এই ৩টি সময়ে অনুমতি নিতে অভ্যস্ত করতে হবে। এটি তাদের চরিত্র গঠনে এবং অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করতে শেখায়।
এটি কি ওয়াজিব নাকি মোস্তাহাব?
ফকিহ ও আলেমদের মতে, এই তিন সময়ে অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব (আবশ্যক)। তবে যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সর্বদা সতর্ক থাকেন এবং উলঙ্গ হওয়ার বা অপ্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে সেক্ষেত্রে এটি মোস্তাহাব বা উত্তম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আক্ষেপ করে বলতেন যে, মানুষ কোরআনের এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটি ছেড়ে দিয়েছে। অথচ আল্লাহ তাআলা পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে পছন্দ করেন।
আমাদের করণীয়: একটি সংক্ষিপ্ত গাইডলাইন
আপনার পরিবারে এই সুন্নাহটি চালু করতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
- সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া: সাত বছর বয়স থেকেই সন্তানদের শেখান যে, মা-বাবার ঘরে প্রবেশের আগে নক করতে হয়।
- সশব্দ পদচারণা: ঘরে প্রবেশের সময় কাশি দিয়ে বা জুতার শব্দ করে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া।
- পর্দার গুরুত্ব বোঝানো: পরিবারের সবাইকে পর্দার মানসিক ও শারীরিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা।




