মদীনায় মসজিদে কুবারপাশেই রয়েছে এক ঐতিহাসিক স্থান। এর নাম বিরে আরিস (بئر أريس)। মদীনায় যারা হজ বা ওমরাহ করতে যান, তাদের অনেকেই এই স্থানটির ইতিহাস জানতে চান। আজ আমরা জানবো এই ঐতিহাসিক কূপের পেছনের কিছু বিস্ময়কর ঘটনা এবং এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে।

রাসূল ﷺ এবং সাহাবীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানইতিহাস থেকে জানা যায়, একদিন রাসূল ﷺ এই কূপের ধারে বসেছিলেন। তিনি তাঁর পবিত্র পায়ের কাপড় কিছুটা গুটিয়ে দুই পা কূপের ভেতরে ঝুলিয়ে বসেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর দুই প্রিয় সাহাবী আবু বকর সিদ্দীক এবং উমর ইবন খাত্তাব রাযি. সেখানে আসেন। তারাও ঠিক একইভাবে রাসূল ﷺ এর পাশে বসেন। এরপর উসমান ইবন আফফান রাযি. এসে তাদের ঠিক বিপরীত দিকে বসেন।
এই বিরে আরিসের কাছে বসেই রাসূল ﷺ আবু বকর এবং উমর রাযি. কে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তিনি উসমান রাযি. কেও জান্নাতের সুসংবাদ দেন, তবে সাথে এমন এক বিপদের কথা জানিয়েছিলেন যা তাকে ভবিষ্যতে মোকাবিলা করতে হবে।
বিরে খাতাম বা আংটির কূপ এই কূপটির আরেকটি পরিচিত নাম হলো বিরে খাতাম বা আংটির কূপ। এই নামের পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। রাসূল ﷺ এর একটি পবিত্র আংটি ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর আংটিটি খলিফা আবু বকর রাযি. এবং তারপর উমর রাযি. এর কাছে সংরক্ষিত ছিল। এরপর উসমান রাযি. যখন খলিফা হন, তখন আংটিটি তাঁর কাছে আসে।
উসমান রাযি. এর খেলাফতকালে একদিন তাঁর হাত থেকে আংটিটি এই কূপে পড়ে যায়। তিনি টানা তিন দিন পর্যন্ত কূপের পানি সেঁচে আংটিটি খোঁজার নির্দেশ দেন। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেটি আর পাওয়া যায়নি। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ঘটনার পর থেকেই মূলত মুসলিম শাসনব্যবস্থায় ফিতনা বা সংকটের সূচনা দেখা দেয়।
জায়েদ ইবন খারিজা রাযি. এর অলৌকিক ঘটনা এই কূপের সাথে সাহাবী জায়েদ ইবন খারিজা রাযি. এর একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা জড়িয়ে আছে। বলা হয়, মৃত্যুর পর তার বুক থেকে অলৌকিকভাবে কিছু কথা শোনা গিয়েছিল। উপস্থিত লোকেরা শুনতে পান তিনি বলছেন, আহমদ সত্য। আবু বকর সিদ্দীক নিজে দুর্বল হলেও আল্লাহর কাজে শক্তিশালী এবং প্রথম কিতাবে তিনি সত্য। উমর ইবন খাত্তাব শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। উসমান ইবন আফফান তাদের পথেই আছেন।
তিনি আরও জানান, চার বছর কেটে গেছে এবং আর দুই বছর বাকি। ফিতনা চলে এসেছে এবং বিরে আরিসের খবর সামনে আসবে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এই ঘটনাটি ঘটেছিল উসমান রাযি. এর খেলাফতের ঠিক চার বছর পর এবং আংটি হারানোর দুই বছর আগে।
বিরে আরিসের বর্তমান অবস্থা একসময় এই কূপটি দৃশ্যমান ছিল এবং কালো পাথর দিয়ে বাঁধানো ছিল। এর গভীরতা ছিল প্রায় ৬.৩ মিটার এবং চওড়া ছিল ২.২ মিটার। পানির স্তর ওঠানামা করত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। ১৩১৭ খ্রিষ্টাব্দে (৭১৪ হিজরি) কূপের নিচে নামার জন্য একটি সিঁড়ি তৈরি করা হয়। উসমানীয় শাসনামলে কূপের ওপর জিপসাম দিয়ে গম্বুজও নির্মাণ করা হয়েছিল।
তবে সময়ের পরিক্রমায় এর রূপ বদলেছে। ১৯৬৪ সালে (১৩৮৪ হিজরি) মদিনা পৌরসভা কূপটির গম্বুজ ভেঙে ফেলে এবং মার্বেল পাথর দিয়ে জায়গাটি পুরোপুরি ঢেকে দেয়। বর্তমানে কূপটি আর আগের মতো দেখা যায় না। তবে এর ঐতিহাসিক স্থানটি চিহ্নিত করার জন্য সেখানে একটি বর্গক্ষেত্রের ভেতর গোলাকার চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে।
মদীনায় জিয়ারতের সময় মসজিদে কুবার আশেপাশে গেলে এই ঐতিহাসিক স্থানটির কথা স্মরণ করতে পারেন, যা আমাদের ইসলামী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী।




