Menu
ভুলে যাওয়া কথা স্মরণ করার চমৎকার পদ্ধতি

ভুলে যাওয়া কথা স্মরণ করার চমৎকার পদ্ধতি: ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর এক অপূর্ব হিকমত

মানুষের ভুলে যাওয়া একটি সহজাত স্বভাব। দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিস কোথায় রেখেছি বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা ভুলে যাই। চাবি, টাকা বা দরকারি নথিপত্র খুঁজে না পেয়ে আমরা অনেক সময় অস্থির হয়ে পড়ি। কিন্তু আপনি কি জানেন, ইসলামে এই ভুলে যাওয়া জিনিস মনে করার বা খুঁজে পাওয়ার এক চমৎকার আধ্যাত্মিক পদ্ধতি রয়েছে? ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর জীবনের একটি বিখ্যাত ঘটনা আমাদের এই বিষয়ে এক দারুণ ও চোখ খুলে দেওয়ার মতো শিক্ষা দেয়।

আজকের ব্লগে আমরা বিখ্যাত ইসলামিক গ্রন্থ ‘খাইরাতুল হিসান’ থেকে নেওয়া সেই চমৎকার সত্য ঘটনাটি জানবো এবং এর পেছনের গভীর শিক্ষাটি বোঝার চেষ্টা করবো।

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) ও এক বিভ্রান্ত ব্যক্তির ঘটনা

ইসলামের ইতিহাসে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং গভীর প্রজ্ঞার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এক অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে হাজির হলেন।

সেই ব্যক্তি তাঁর কিছু মূল্যবান মাল বা সম্পদ মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি কোনোভাবেই সেই জায়গাটি আর মনে করতে পারছিলেন না। অনেক খোঁজাখুঁজি এবং চিন্তা করেও যখন তিনি ব্যর্থ হলেন, তখন নিরুপায় হয়ে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর কাছে গিয়ে পরামর্শ চাইলেন।

ইমামের দেওয়া অভিনব সমাধান

ব্যক্তিটির সমস্যা শুনে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) মুচকি হাসলেন। তিনি বললেন, “এটি তো কোনো ফিকহী মাসআলা বা আইনি সমস্যা নয় যে আমি এর কোনো ধর্মীয় ফতোয়া বা সমাধান বলে দেব। তবে আমি তোমাকে একটি চমৎকার বুদ্ধি দিতে পারি। তুমি আজ রাতে বাড়ি গিয়ে ফজর পর্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে নামায পড়তে থাকো। আশা করা যায়, এর মধ্যেই তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া জায়গাটির কথা স্মরণ হয়ে যাবে।”

নামাযের মাঝে শয়তানের চাল এবং সম্পদ উদ্ধার

ইমামের কথা মতো সেই ব্যক্তি রাতে বাড়ি ফিরে ওযু করে আল্লাহর দরবারে নামাযে দাঁড়ালেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, রাতের মাত্র এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ) সময় পার হতেই তাঁর মনে পড়ে গেল ঠিক কোন জায়গায় তিনি তাঁর সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলেন।

জায়গাটি মনে পড়ার পর তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে নামায শেষ করলেন এবং নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক দূরদর্শিতা ও আফসোস

পরদিন সকালে ওই ব্যক্তি মহানন্দে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন। সব শুনে ইমাম সাহেব মোটেও অবাক হলেন না। তিনি বললেন:

“আমার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, শয়তান তোমাকে কিছুতেই সারা রাত শান্তিতে নামায পড়তে দেবে না। সে চাইবে যেকোনো উপায়ে তোমার নামায নষ্ট করতে। তাই সে দ্রুত তোমার মনে হারিয়ে যাওয়া মালের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যেন তুমি নামায ছেড়ে দাও।”

এরপর ইমাম সাহেব একটি গভীর আফসোস প্রকাশ করে বললেন, “তবে তোমার প্রতি আমার বড় আফসোস রইল! সম্পদ ফিরে পাওয়ার পর আল্লাহ তাআলার প্রতি শুকরিয়াস্বরূপ তোমার কি উচিত ছিল না সারা রাত নামাযে কাটিয়ে দেওয়া? তুমি কেন নামায বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লে?” (উৎস: খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা ১২১)

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর এই অসাধারণ হিকমত বা প্রজ্ঞা থেকে আমরা দুটি বড় শিক্ষা পাই:

১. শয়তানের মনস্তত্ত্ব: শয়তান কখনোই চায় না মানুষ আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকুক। আমাদের ইবাদত থেকে দূরে সরাতেই সে দুনিয়াবি নানা চিন্তা বা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কথা আমাদের মাথায় এনে দেয়। ২. কৃতজ্ঞতার অভাব: আমরা বিপদে পড়লে আল্লাহকে অনেক ডাকি, কিন্তু বিপদ কেটে গেলে বা কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে গেলে সহজেই আল্লাহর কথা ভুলে যাই। সম্পদ বা হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পাওয়ার পর আমাদের উচিত ছিল আল্লাহর দরবারে আরও বেশি কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া) প্রকাশ করা।

শেষ কথা

আপনারও যদি কখনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বা জিনিস ভুলে যাওয়ার সমস্যা হয়, তবে অস্থির না হয়ে আল্লাহর দরবারে নামাযে দাঁড়িয়ে যান। তবে মনে রাখবেন, শুধু দুনিয়াবি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে ইবাদত করাটাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়।

হজ, ওমরাহ এবং ইসলামের এমন সুন্দর সুন্দর শিক্ষণীয় ঘটনা ও গাইডলাইন পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের Tabligh Hajj ওয়েবসাইটে।